মক্কারো বলি খেলার ইতিহাস

চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার অন্তর্গত মাদার্শা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী খেলা মক্কারো বলি খেলা প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ৭ তারিখ শুরু হয়।এ খেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নামকরা বলিগণ অংশগ্রহণ করেন।
একনজরে জেনে নিন মক্কারো বলি খেলার ইতিহাস।

সাতকানিয়ার মাদার্শা মক্কার বাড়ির বংশধর, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক ড. আবুল আলা মুহাম্মদ হোছামুদ্দিন বলেন, এখন থেকে তিন শতাধিক বছর পূর্বে তাদের পূর্ব পুরুষ সৌদি আরবের মক্কার বাসিন্দা ইয়াছিন মক্কী ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সাতকানিয়ায় আসেন এবং মাদার্শার পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করেন।

এরপর থেকে এলাকাটি মক্কা বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইয়াছিন মক্কী এলাকায় ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি কিছু ব্যবসাও শুরু করেন। হজ্ব মৌসুমে তিনি বাংলাদেশের অনেক হাজীকে হজ্ব করানোর জন্য সৌদি আরবে নিয়ে যেতেন। এক সময় তিনি সাতকানিয়ার মাদার্শা এলাকায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। সে সুবাদে সাতকানিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে তিনি বিপুল পরিমান জায়গা কিনে নেন। বিয়েও করেছেন বাংলাদেশ থেকে।

ইয়াছিন মক্কী এক হজ্ব মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু হাজী নিয়ে সৌদি আরবে যান এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ইয়াছিন মক্কীর পরবর্তী প্রজন্ম জমিদারি প্রথা চালু করেন। ১৮৭৯ সালে ইয়াছিন মক্কীর নাতি কাদের বক্সু চৌধুরী খাজনা দিতে আসা প্রজা এবং এলাকার লোকজনকে আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্যে সর্ব প্রথম বলী খেলার আয়োজন করেন। এরপর থেকে এটি মক্কার বলি খেলা নামে পরিচিত লাভ করে।

কাদের বক্স এর নাতি ও বর্তমানে মক্কার বলী খেলার মূল আয়োজক নাজেমুল আলম চৌধুরী বলেন, আমার দাদা মূলত খাজনা দিতে আসা লোকজন এবং এলাকার মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য বলীখেলার আয়োজন করতেন। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সবাই দল বেঁধে খাজনা দিতে আসতেন। ওই দিন মক্কার বাড়ি এলাকায় খাজনা দিতে আসা লোকদের ভিড় জমে যেতো। আমার দাদা খাজনা দিতে আসা লোকদের জন্য মেজবানের আয়োজন করতেন। খাজনা প্রদানকারী এবং এলাকার মানুষকে বাড়তি আনন্দ দিতে বলী খেলার আয়োজন করতেন। শুরুর দিকে বাড়ির সামনে বিশালাকৃতির একটি গাছের টুকরো রাখতেন।

খাজনা দিতে আসা এবং স্থানীয় লোকদের মধ্য থেকে যারা ওই গাছের টুকরো উপরে তুলতে পারতেন তারাই কেবল বলী খেলার উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হতেন। গাছের টুকরা ওঠানোর যারা যোগ্যতা অর্জন করতেন তাদের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা বলি খেলা হতো এবং বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার দিতেন। গাছের টুকরো তুলে প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনকারীরা বলীখেলায় হেরে গেলেও তাদের মাঝে শান্তনা পুরস্কার বিতরণ করতেন। এভাবে চলতে চলতে মক্কার বলীখেলা এক পর্যায়ে এলাকার মানুষের আনন্দের মূল কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। সাতকানিয়া ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে বলী খেলা দেখতে উৎসুক জনতা মক্কার বাড়ি এলাকায় ভিড় জমান। এরপর থেকে বলী খেলা উপলক্ষে মেলার আয়োজন শুরু হয়।

নাজেমুল আলম চৌধুরী আরো জানান, আমার দাদা যেহেতু বৈশাখের ৭ তারিখে খেলার আয়োজন করতেন আমরাও একই তারিখে বলী খেলা এবং মেলার আয়োজন করি। কোন ধরনের প্রচার প্রচারণা ছাড়াই এই মক্কার বলী খেলায় চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য লোক খেলা দেখতে ছুঁটে আসেন। বলী খেলা উপলক্ষে মক্কার বাড়ির আশপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা। মেলার আগের দিন থেকে দোকানীরা নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। সেখানে খাবার, কাপড়-চোপড়, কসমেটিকসের দোকান ছাড়াও বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্র, নানা কৃষি উপকরণসহ গ্রামীণ পরিবারে সারা বছরের প্রয়োজনীয় যাবতীয় সামগ্রী মেলায় পাওয়া যায়। লোকজন বলী খেলা উপভোগের পাশাপাশি মেলা থেকে ব্যবহারের সব জিনিসপত্রও কিনে নেন।

তিনি আরো জানান, বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সকাল থেকে মেলায় কেনা-কাটা হলেও বলী খেলা শুরু হয় মূলত বিকালে। সমস্ত মেহমান এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বলীদের খাবারের পর দুপুর আড়াই টার দিকে মক্কার বাড়ির লোকজন হলুদ রঙের বিশাল আকৃতির ছাতা মাথায় দিয়ে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে মাঠে প্রবেশের পর শুরু হয় বলী খেলার মূল কার্যক্রম। মক্কার বাড়ির লোকজন মাঠে উপস্থিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থান হতে আগত বলিদের মধ্যে থেকে বলি খেলা শুরু হয় এবং খেলা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র : https://www.alokitosatkanianews.com/archives/2872 থেকে সংগৃহীত।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s